ইহুদিদের হানুকা উৎসব শুরুর দিনই সিডনির বন্ডি বিচে নারকীয় হামলায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই দুঃসহ ঘটনার ক্ষত মুছতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। এরমধ্যেই আরও একটি হামলার ছক বানচাল করে দিল পুলিশ। সিডনির বন্ডি বিচে ঘটনার তদন্তে জড়িত পুলিশ আধিকারিকদের কাছে গোপন সূত্র মারফত কিছু তথ্য আসে। তার ভিত্তিতেই অভিযান চালিয়ে দু’টি গাড়ি আটক করে সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নিউ সাউথ ওয়েলসের পুলিশ। পুলিশের দাবি, একটি হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
বন্ডির সমুদ্র সৈকতে ইহুদি উৎসব হানুকা চলাকালীন যে দুই বন্দুকবাজের হামলায় প্রাণ হারাতে হয়েছে ১৫ জনকে, তাঁরা পাকিস্তানি নন, ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তাদের মধ্যে একজনের জন্ম ভারতের হায়দরাবাদে। আর এক আততায়ী তারই ছেলে। হামলাকারী বাবা-ছেলের পরিচয় প্রকাশ্যে আসার পরে তাদের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ শুরু হয়। তখনই প্রকাশ্যে আসে যে বছর ৫০-এর সাজিদের ভারতীয় পাসপোর্ট ছিল। তবে তার ছেলে নাভিদ অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের সন্ত্রাসবাদের কালো ছায়া বন্ডি সৈকতের উপরে। যদিও নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত দুঃখজনক কিছু ঘটেনি। নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, একটি হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এমন তথ্য পাওয়ার পরেই অভিযান চালানো হয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘হামলার ছক রয়েছে, খবর পেয়ে দু’টি গাড়িকে ধাওয়া করেন স্পেশাল ট্যাকটিস শাখার আধিকারিকরা। সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’ প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, ধৃতদের সঙ্গে বন্ডি হামলার কোনও যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।
পুলিশ সূত্রে খবর, মেলবোর্ন থেকে ভিক্টোরিয়ার নম্বর প্লেটের দু’টি গাড়িতে করে ওই সাত ব্যক্তি সিডনির লিভারপুল এলাকা দিয়ে যাচ্ছিল। গোয়েন্দাদের কাছে আগে থেকেই খবর ছিল, বন্ডি বিচে কোনও নাশকতার পরিকল্পনা চলছে। একটি হুন্ডাই আই-৩০ গাড়িতে সন্দেহভাজন পাঁচ ব্যক্তি রয়েছে বলেও খবর এসেছিল নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের কাছে। এরপর একটি ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি নিয়ে গিয়ে ওই হুন্ডাই আই-৩০ গাড়িটিকে বেশ কয়েকবার ধাক্কা মেরে থামায় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী। তারপর রাবার বুলেট ছুড়ে সন্দেহভাজন পাঁচজনকে কাবু করে। পরে আরও একটি গাড়ি থেকে বাকি দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়। সূত্রের খবর, ধৃতদের কাছ থেকে বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। ধৃতদের সকলের উপরেই এর আগে থেকেই নজর রাখছিল ভিক্টোরিয়া পুলিশ বলে জানা গিয়েছে।

এরই মধ্যে জানা গিয়েছে, বন্ডি বিচে হামলার সময় এক আততায়ীকে নিরস্ত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত। ঘটনার দিনে নিজের অভিজ্ঞতার কথা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন ৩৪ বছরের অমনদীপ সিং বোলা। অভিশপ্ত ১৪ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বন্ডি বিচে ইহুদিদের উৎসবে হামলা চালিয়েছিল সাজিদ আক্রম এবং তার ছেলে নাভিদ আক্রম। এরমধ্যে পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় সাজিদের। জখম নাভিদের চিকিৎসা চলছে। এই সাজিদকে খতম করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আমনদীপ। তাঁর ভূমিকা সামনে আসতেই বীরের মর্যাদা পাচ্ছেন ৩৪ বছর এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত। অমনদীপ জানাচ্ছেন, কোনও একজন আততায়ীকে তিনি বাগে আনতে চেয়েছিলেন। পাশাপাশি যাদের সাহায্যের প্রয়োজন, তাঁদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ানোই লক্ষ্য ছিল তাঁর। আমনদীপের বাবা ভারতীয়। মা নিউজিল্যান্ডের। জন্ম ওয়েলিংটনে হলেও এখন থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। এসবিএস নিউজের খবর অনুযায়ী, গুলির শব্দ পেয়ে তিনি বন্ডি সৈকতের সেতুর কাছে ছুটে যান। তাঁর কথায়, ‘আমি বন্দুকবাজের উপর লাফিয়ে পড়ে তার হাত চেপে ধরি। পুলিশ আধিকারিকরা আমাকে নির্দেশ দিলেন একদম ছাড়বেন না।’ পেশায় ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক আমনদীপ আরও জানান, ‘সেদিন যে গুলি চলছিল, তা বুঝতেই পারিনি। ভেবেছিলাম কেউ বাজি ফাটাচ্ছে। তবে ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পেরে একটি জায়গায় লুকিয়ে পড়ি। কেবল দেখতে চেয়েছিলাম বন্দুকবাজ কোথায় রয়েছে। তাকে দেখার পর আর দেরি করিনি। পুলিশ গুলি করার পরে আততায়ীকে ধরে সামনের দিকে পড়ে যাই। বুঝতে পারি, সে মারা যাচ্ছে।’