হরমুজ পেরোতে জাহাজ প্রতি ২০ লক্ষ ডলার মাশুল ইরানের? চাপ বাড়ল ভারতের?

Spread the love

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের সঙ্গে তাদের চলতে থাকা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য জলপথ হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে ইরান কিছু জাহাজের যাতায়াতের ক্ষেত্রে ২০ লক্ষ ডলার মাশুল আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সদস্য এবং আইনপ্রণেতা আলাউদ্দিন বোরুজেরদি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরান ব্রডকাস্টিং’ (আইআরআইবি)-কে জানিয়েছেন, এই বিশাল অঙ্কের মাশুল আদায়ের প্রক্রিয়াটি ইতিমধ্যেই কার্যকর করা হয়েছে।

ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুসারে, বোরুজেরদির মতে, এই পদক্ষেপটি হরমুজ প্রণালীতে কয়েক দশক পর একটি নতুন ‘সার্বভৌম শাসনব্যবস্থা’র সূচনা করল। তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী নির্দিষ্ট কিছু জাহাজের কাছ থেকে ট্রানজিট ফি হিসেবে ২০ লক্ষ ডলার আদায় করাটা ইরানের ক্ষমতারই প্রতিফলন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন, যেহেতু যুদ্ধের খরচ আছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই আমাদের এটি করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলো থেকে ট্রানজিট মাশুল নিতে হবে।’ তিনি এই মন্তব্য করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গত সপ্তাহের সেই সতর্কবার্তার পর, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালী ফের খুলে দেওয়া না হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। রবিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাম্প বলেছিলেন,যদি ইরান প্রণালীটি খুলে না দেয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র-শুরুতেই সবচেয়ে বড়টি-ধ্বংস করে দেবে।’

ট্রাম্পের হুমকির কথাও বোরুজেরদি উল্লেখ করে বলেছেন, ইজরায়েলের জ্বালানি পরিকাঠামো ইরানের নাগালের মধ্যে চলে আসবে এবং ‘এক দিনের মধ্যেই’ তা ধ্বংস করে দেওয়া যেতে পারে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও ট্রাম্পের হুমকির জবাব দিয়েছেন। ‘এক্স’ বার্তায় তেহরানের নীতি তুলে ধরে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী ইরানের শত্রুপক্ষ ছাড়া ‘বাকি সবার জন্যই উন্মুক্ত।’ তিনি লেখেন, ‘মানচিত্র থেকে ইরানকে মুছে ফেলার অলীক কল্পনা মূলত একটি ইতিহাস-স্রষ্টা জাতির ইচ্ছাশক্তির বিরুদ্ধে তাদের চরম হতাশারই বহিঃপ্রকাশ। হুমকি এবং সন্ত্রাস কেবল আমাদের ঐক্যকেই আরও সুদৃঢ় করে। যারা আমাদের ভূখণ্ডে আগ্রাসন চালায়, হরমুজ প্রণালী তাদের ছাড়া বাকি সবার জন্যই উন্মুক্ত। যুদ্ধক্ষেত্রে দেওয়া এই ধরনের প্রলাপসুলভ হুমকির আমরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করব।’ এদিকে, ভারতগামী জাহাজ-সহ কয়েকটি জাহাজ যুদ্ধবিধ্বস্ত জলপথটি অতিক্রম করতে পারলেও, মার্কিন-ইজরায়েলি হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা আক্রমণের কারণে বেশ কয়েকটি জাহাজ হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়েছে।

তেলের দাম

ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম এবং ইজরায়েলের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের লাফ দিয়েছে। সোমবার (২৩ মার্চ) আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেন শুরুর পরপরই তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। রবিবার রাত ১০টায় বাজার খোলার পরপরই মার্কিন অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)-এর মে মাসের সরবরাহ মূল্য ১.৮ শতাংশ বেড়ে ১০০.১১ ডলারে পৌঁছয়। অন্যদিকে, নর্থ সি ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দামও পাল্লা দিয়ে বেড়ে সর্বোচ্চ ১১৩.৪৪ ডলারে ওঠে। লেনদেনের শুরুর দিকে এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা গেলেও পরে তা কিছুটা স্থিতিশীল হয়।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সতর্কবার্তা

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোল বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতি ‘একটি বড় হুমকির’ মুখে পড়েছে। বর্তমান সংকটটি মূলত তেল সংকট এবং গ্যাস বিপর্যয়ের সম্মিলিত রূপ। অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে ফাতিহ বিরোল জানান, ‘আজ বৈশ্বিক অর্থনীতি একটি বড় হুমকির মুখে রয়েছে এবং আমি আশা করি যত দ্রুত সম্ভব এই সংকটের সমাধান হবে…। এই পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে, তাহলে কোনো দেশই এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না। তাই বৈশ্বিক প্রচেষ্টা জরুরি।’ তিনি বলেন, চলমান সংঘাতে অঞ্চলের অন্তত ৪০টি জ্বালানি স্থাপনা গুরুতর বা অত্যন্ত গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি, আইইএ এশিয়া ও ইউরোপের সরকারগুলোর সঙ্গে মজুত তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *