পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কড়া মন্তব্য করলেন রাজ্যপাল আর এন রবি। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি নাম না করেই রাজ্যের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতিকে পরোক্ষভাবে নিশানা করেন বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, আদর্শগত অবস্থান এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে একাধিক সমালোচনা।
রাজ্যপাল বলেন, বিকৃত আদর্শ এবং ভুল রাজনৈতিক চর্চার ফলেই বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, এক সময় শিক্ষা, সংস্কৃতি, বৌদ্ধিক চর্চা এবং জাতীয় জীবনে নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে বাংলা দেশের অন্যতম অগ্রণী রাজ্য ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই অবস্থানের অবনতি ঘটেছে। এর জন্য দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই দায়ী করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘স্বাধীনতার প্রাক্কালে বাংলা ছিল সমগ্র দেশের আলোকবর্তিকা। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি ছিল এই বাংলা। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলা ছিল অগ্রপথিক। ষাটের দশকে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের দেখে ঈর্ষাবোধ করতাম। সেই গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলোতে দেশের মোট জিডিপি-র প্রায় ১১ শতাংশই আসত কেবল এই বাংলা থেকে। কিন্তু এরপরই শুরু হল আমাদের অধঃপতন। সেই পতন শুরু হওয়ার ফলে একসময় আমরা পরিণত হলাম এক চরম দুর্দশাগ্রস্ত ও পরনির্ভরশীল রাজ্যে। এক বিকৃত আদর্শ ও ভ্রান্ত রাজনীতিই এই রাজ্যের সর্বনাশ ডেকে এনেছিল।’
আর এন রবির বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক স্বার্থে সমাজকে বিভক্ত করার প্রবণতা এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করার রাজনীতি রাজ্যের ক্ষতি করেছে। তিনি বলেন, কোনও প্রতিষ্ঠান বা সাংবিধানিক ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নিজের পক্ষে না গেলে সেটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ নয়। বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন বা অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করার চেষ্টা করা হলে তার নেতিবাচক প্রভাব সমাজের উপর পড়ে।

রাজ্যপাল আরও মন্তব্য করেন, নির্বাচনে জয়ী হলে গণতন্ত্রকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, কিন্তু পরাজিত হলে ভোট লুট বা কারচুপির অভিযোগ তোলা হয়। তাঁর মতে, এই ধরনের বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপর আঘাত হানে। তিনি বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হলেও অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। রাজ্যের উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ইতিবাচক রাজনীতি করতে হবে। বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্য এবং উন্নয়নমুখী চিন্তাভাবনাই বাংলাকে আবার তার পুরনো মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে পারে।রাজ্যপালের এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। যদিও তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের নাম সরাসরি উচ্চারণ করেননি, তাঁর বক্তব্যের লক্ষ্য কারা ছিল তা নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সিপিএমের দীর্ঘ বাম শাসন এবং পরবর্তী তৃণমূল সরকারের আমলের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর মন্তব্যকে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।