এসআইআর চাদরে ঢেকে যাবে নিয়োগ দুর্নীতি, বেকারত্ম, নারীসুরক্ষা, ভাঙনের মতো বিষয়? পশ্চিমবঙ্গের ১৫২টি বিধানসভা আসনের ভোটাররা সেই প্রশ্নের উত্তর দেবেন বৃহস্পতিবার।
রেকর্ড সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন
কারণ রাত পোহালেই পশ্চিমবঙ্গের ১৬টি জেলার (কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান এবং বীরভূম) ১৫২টি বিধানসভা আসনে ভোটগ্রহণ হবে। সেজন্য একেবারে কড়া নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। হিংসামুক্ত ‘নয়া’ বাংলার নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেকর্ড ২,৪৫০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করেছে নির্বাচন কমিশন। ৮,০০০-র বেশি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রকে অতি স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সবকিছু ছাপিয়ে SIR হয়ে উঠবে মূল ইস্যু?
সেই অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেই এখন যে প্রশ্নটা সবথেকে বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে, সেটা হল যে এসআইআরের (ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা) ফলে আখেরে কি লাভই হবে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের? ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া সামলে কি মুসলিম ভোট একতরফা ভোট পাবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রা?
প্রথম দফায় যেখানে যেখানে ভোট হচ্ছে, সেখানকার জমি (জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের চা বাগান; দার্জিলিং ও কালিম্পঙের পাহাড়; কোচবিহারের রাজবংশী ভোট; মালদা, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী এলাকা ও সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত এলাকা) সম্পূর্ণ আলাদা হলেও অধিকাংশ জেলায় মুখ্য হয়ে উঠেছে এসআইআর ইস্যু। এসআইআর প্রক্রিয়ায় রাজ্যের ভোটারর তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ নাম বাদ পড়েছে। তার ফলে ভোটার সংখ্যা কমে গিয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। তার জেরে ‘নিয়োগ দুর্নীতি’, ‘নারী সুরক্ষা’, ‘বেকারত্ব’, ‘সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প’, ‘শিল্প’-র পরিবর্তে রাতারাতি ভোটের জনপ্রিয়তম শব্দের ধারা পালটে গিয়েছে। ‘নাগরিকত্ব’, ‘অনুপ্রবেশ’, ‘জালি ভোটার’, ‘বাতিল নাম’, ‘বিদেশি’-র মতো শব্দ বারবার শোনা গিয়েছে প্রচার-পর্বে।

‘দেশ সাফাই’ বনাম ‘প্রকৃত ভোটারের হেনস্থা’
বিজেপি তুলে ধরার চেষ্টা করেছে যে দেশের স্বার্থেই এসআইআর করা হয়েছে। অনুপ্রবেশকারীতে ভরে গিয়েছিল বাংলা। তৃণমূলের মদতে অনুপ্রবেশকারীরা প্রকৃত ভারতীয়দের ক্ষমতা ছিনিয়ে নিচ্ছে। আবার রাজ্যের শাসক দলের তরফে পালটা দাবি করা হয়েছে যে এসআইআরের নামে প্রকৃত ভোটারদের নাম ছেঁটে ফেলা হয়েছে। টার্গেট করা হয়েছে মূলত সংখ্যালঘু (মুসলিম), গরিব এবং পরিযায়ীদের।
আসলে এসআইআরের ফলে সাধারণ মানুষের একাংশের মনে যে ভয়টা কাজ হচ্ছে, সেটা আরও উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করেছে তৃণমূল। অনেকেই এমন আছেন, যাঁরা হয়তো তৃণমূলকে ভোট দিতেন না। কিন্তু এসআইআরের হিয়ারিংয়ে ডাক পাওয়ায় বা অ্যাডজুডিকেশন লিস্টে নাম থাকার কারণে যে হেনস্থার শিকার হয়েছেন, তার জেরে বিজেপিকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন।একইভাবে চাকরির অভাব, ওবিসি সংক্রান্ত বিষয়ের জন্য যে মুসলিমরা কংগ্রেস, বাম, হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টিকে, আইএসএফ, মিমকে ভোট দিতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছিল; তাঁরা এসআইআরের কারণে এককাট্টা হয়ে তৃণমূলকে ভোট দিতে পারেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। ২০১১ সাল থেকেই মমতার সংখ্যালঘু ভোট এককাট্টা রয়েছে। যা তৃণমূলকে ১৫ বছর ক্ষমতায় রেখে দিয়েছে। সেই ভোটব্যাঙ্কে যদি ফাটল ধরে যায়, তাহলে বিজেপির ক্ষমতায় আসার প্রশস্ত হবে। কিন্তু এসআইআর-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ নীতি অনুসরণ করে আবার ঘাসফুলেই মুসলিমরা ঢেলে ভোট দিতে পারেন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।